গন্তব্য জানা নেই ……

বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে

বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে

দেখিতে গিয়াছি পর্বত মালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু ।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া,

ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া 

একটা ধানের শিষের উপরে, একটি শিশির বিন্দু ।

রবি ঠাকুরের এই কবিতা ছোটবেলা বাবার কাছে শুনে মনে মনে ভেবেছি আমি আগে বাংলাদেশ দেখবো তারপর বাকি সব কিন্তু সেই আশার প্রথম যাত্রা করতে করতেই জীবনের ২৩ বছর পার হয়ে গেলো,কিন্তু কিছুতেই আর যাওয়া হচ্ছিল না কারন আমার মা খুব ভয় পায় আমাকে নিয়ে ।

কই না কই যাব হাত ভাঙবো না মাথা ফাটিয়ে বাড়ি ফিরবো সেই ভয়ে আমার মা, বাবা আর বোনের রাত দিন এক হয়ে যেতো তাই আর কোন দিন কোথাও যাওয়া হচ্ছিলো না , তাও একবার খুব বায়না করে এক বন্ধুর নানার বাড়ি গেয়েছি অনেক বলে কয়ে ।

মাকে যখন জানালাম বরিশাল বন্ধুর নানা বাড়ি যাবো, মা বলে “পানির মাঝে যাওয়ার কি দরকার?”  কি আজব বন্ধুর নানারা কি পানির উপর থাকে ?? সেই কথা মাকে কে বুঝায়? 

তো একবার বিকাল বেলা আমরা ৪ বন্ধু অনেক আলোচনা করে ঠিক করলাম সিলেট যাবো রাতের ট্রেনে, সারাদিন সিলেট ঘুরে আবার রাতের ট্রেনে করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবো কিন্তু মুশকিল হোল মা কে কিভাবে বলব, যাই হোক সকাল বেলা মাকে বললাম মা টাকা দাও সিলেট যাবো আজ রাতে ।

মনে মনে ভাবলাম আল্লাহ জানে কি বলবে কিন্তু ঘটলো তারচেয়ে ভয়ানক ঘটনা , মা কিছুই না বলে টাকা দিয়ে দিলো । আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে টিকেট কিনতে চলে গেলাম বন্ধুদের সাথে , যেহেতু ১২ ঘণ্টার মাঝে সব তাই খুব একটা প্রস্তুতি নেয়া ছিলো না, রাত ১০টার ট্রেন ছিলো ।

ট্রেন ছাড়ার ১ মিনিট আগে আমি উঠলাম । আর বন্ধুরা তো ইচ্ছা মত আমাকে ধোলাই দিলো । সেই ধোলাই খেয়ে খারাপ লাগেনি ।

ট্রেন ঢাকা ছাড়ানোর পর শুরু হল আমাদের প্রধান সমস্যা , হুট করেই পরিকল্পনা তাই কই যাবো, কি করবো, কোথায় নামবো তার কোন ঠিক নাই । একবার সিলেট, একবার শ্রীমঙ্গল, একবার আজানা আবার অন্যবার বাসায় ফিরে আসবো এমন অবস্তা ।

পরিশেষে ঠিক হল আমরা শ্রীমঙ্গল নামবো কিন্তু সেই অঞ্চলের কিছু আমাদের জানা নাই । রাত ৩.৩০ মিনিটে আমারা নেমে পরলাম । নেমে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার – প্লাটফর্ম থেকে বের হবার পথটাও আমাদের অজানা , ভাগ্য সহায় একটি পরিবার ও আমাদের সাথে ছিল তারা ইষ্টিশন মাস্টারের সাথে কথা বলে অপেক্ষার কক্ষ খুলে নেয় ।

আমরাও আমাদের পদ ধুলি সেখানে ফেলি । তারপর নেটওয়াক এর সাথে যুদ্ধ জয় করে খুঁজে বের করি সেখানে ঘুড়ার কি কি আছে । তার মাঝে আমাদের এক বন্ধুর বায়না সে ঝর্না না দেখে যাবে না , যেই সেই ঝর্না হলে হবে না ।

দিনের আলো ফুটতে শুরু করার পর বের হলাম নাস্তা করার জন্য, সেখানে ক্যাশিয়ার লোকেটির কাছে জানতে চাইলাম এইখানে কই কই ঘুরা যায় । সে ৭-৮ টা জায়গা বলল কিন্তু আমাদের বন্ধুর একটাই কথা সে ঝর্না দেখবে , কে জানে ওর আগের বালিকা বন্ধুর নাম মনে হয় ঝর্না ছিলো ।

লোকটা বলল আপনারা মাধবকুণ্ডে যান, ঝর্নার সাথে অনেক কিছু দেখতে পাবেন কিন্তু আমাদের সেই বন্ধুর এক কথা এমন কম পানির কিছু দেখবো না , বেশি পানির ঝর্না দেখবে । লোকটা তখন জানালো হাম হাম একটা জায়গা আছে সেখানে অনেক পানি আছে কিন্তু অনেক হেটে যেতে হবে ।

সেই লোকটাই আমাদের সারাদিনের জন্য সি এন জি ঠিক করে দিলো । সকাল ৭ টায় রওনা হলাম, আমরা যে ৪ জন ছিলাম আমাদের কারোরই ভ্রমন বিষয়ে অভিজ্ঞতার বেশি ছিল না । যাবার পথে আমরা এইখানে থামি ঐখানে থামি আর ছবি তুলি , সি এন জির লোকটা একটু তাড়া দিচ্ছিলো , যেহেতু আমরা নতুন তাই সেই আমাদের একজন গাইড যোগাড় করে দেয় , লবন বা শুকনো খাবার কিনতে দোকানে নিয়ে যায় । বিষয়টা একটু ভয় লাগছিলো কারন আমাদের কাছে অনেক কিছুই ছিল , মোবাইল , ক্যামেরা , লেন্স, টাকা … আর আমার হুট করেই করেছি তাই কোন হোটেল ভাড়া করার বিষয় ছিলো না এবং সম্পূর্ণ বিষয়টি বুঝিও নি । সি এন জি ড্রাইভার আমাদের যখন একটা কাচা রাস্তার মাথায় নামিয়ে দিয়ে বলল , আপনার যান আমি আছি ।

আমাদের গাইড

শুরু করলাম হাঁটা তখন কাধের ব্যাগ গুলা হালকাই মনে হচ্ছিলো । আমরা চা বাগানের মাঝে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম । খুব ভালোই লাগছিলো কারন সকাল বেলা , ঢাকায় থাকার জন্য তো এইগুলা কোন দিন দেখা হয় না , আমরা মোড়ে মোড়ে দাড়াই আর ছবি তুলি, কাপড় পরিবর্তন করে ছবি তুলি , এক পাহাড় দেখে তার উপর উঠে চারপাশ দেখি ।

তখন ও জানতাম না আমাদের জন্য সামনে কি অপেক্ষা করছে । আমাদের গাইড বলল তাড়াতাড়ি করেন সামনে অনেক পাহাড় পাবেন । ভাবলাম বার বার পাহাড়ে কে উঠে ছবি তুলবে একবার উঠেছি এই শেষ ।


আরো পড়ুন


ছবি তুলে বনের কাছে এসে বন্য বিভাগের লোকদের কাছে সব লিখে রওনা হলাম , বনটা শুরুতে সমতল । ভালোই লাগছিলো , সামনে যাচ্ছি একটু একটু করে উচু হচ্ছে । একটু খাঁড়া পাহাড় উঠেই আবার একটু সমতল হাঁটতে হচ্ছে । বিপত্তি শুরু হয় যখন কোন সমতল নেই শুধু মাত্র এক পাহাড় চড়ে আবার পরের পাহাড়ে উঠছি ।

শহরের মানুষ এত কষ্ট নেয়া কঠিন তার উপর আমরা নিয়মিত ভ্রমণ করি না । ৩০ মিনিট যাবার পর মনে হচ্ছিলো এইটা এক অনন্ত কালের পথ এর কোন শেষ নাই । আমরা গহীন বনের মাঝে পাহাড়ের চূড়ায় , মোবাইলের নেটওয়ার্ক নাই , অচেনা এক লোক সাথে এবং টাকা পয়সা ওইগুলা ও সাথে । আমার মনে একটাই ভয় আমি তো মাকে বলে আসিনাই যে আমি এই গহীন জঙ্গলে আসবো ।

মা যদি ফোনে না পায় তাইলে কি করবে । এমন হাজার ও চিন্তা মাথায় নিয়ে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছি । তার মাঝে মুশকিল হল এত গরম এক সেকেন্ড ও দাঁড়াতে পারছি না , মনে হচ্ছে লোম কুপ গুলো এখনি ফেটে যাবে এবং আমাদের গাইডও নতুন ছিল পরে বুঝলাম কারন সে বাকি পাহাড়িদের জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছিল ঝর্না যাবার রাস্তা এইটা কিনা ।

আমরা পানিও কম নিয়েছিলাম কারন বুঝতে পারি নাই। তখন পানি ও ছিল না এবং জোঁক , পোকা মাকড়ের অত্যাচার তো ছিলোই । এই সমস্ত কিছু দেখে আমাদের যে বন্ধু ঝর্না দেখার জন্য এত পাগল ছিল সেই বলে বসলো “আমি আর যামু না , আমি বাসায় ফিরমু” এইটা শুনে আমাদের দুইজনের রাগ উঠে গেলো,  বললাম আসছি যখন যাবোই যাবো ।

অন্য এক বন্ধু বলল দেখ গেলাম কিন্তু ফিরে কি আসতে পারবো ??? তোরা দুজন ভালো করে ভেবে দেখ । যাই হোক দুজনের আপত্তির পরে ও আমরা আমাদের সামনে যাওয়া অব্যাহত রাখলাম ।

অনেক কষ্টে যখন সর্ব শেষ পাহাড়ে উঠলাম যখন দেখা গেলো আমাদের এক বন্ধুকে জোঁকে ধরেছে , অনেক কষ্ট করে তা ছাড়ালাম কিন্তু তার রক্ত বন্ধ হচ্ছিলো না । গাইড কি এক পাতা এনে দিলো , বলল চেপে ধরে রাখতে, প্রথমে লোকটা কে যেমনই লাগুক কিন্তু লোকটা অনেক অনেক ভালো ছিল , আমাদের অনেক অনেক অনেক সাহায্য করেছে, পাহাড়ি লোকটা এক কথা অসাধারণ ছিল ।

সেই পাহাড় থেকে নামতে খুব কষ্ট হয়েছে কারন পায়ে কোন শক্তি ছিল না আর এত খাঁড়া পাহাড় নামা খুব কঠিন । কারন ১.৩০ মিনিট ধরে ধিরে ধিরে যে উচ্চতায় উঠেছি বাকি ৩০ মিনিটে সেটা নামতে হবে । অবশেষে যখন ঝর্নার খারীর দেখা পেলাম তখন মনে একটু শান্তি পেলাম কিন্তু ঐ যে কপাল , ঢাকা থেকে যেভাবে প্যাকেট হয়ে গিয়েছি সেভাবে কি আর নামা যাবে ?? জুতা খুলে ব্যাগে নিয়ে পানিতে পা দেবার পর গত ২ ঘণ্টার কষ্ট নিমিষের মধ্যে চলে গেলো ।

তার পর আরও অনেক অনেক ঘটনা ঘটিয়ে ওই রাতেই বাড়ি ফিরে আসি , ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু নিয়ে এসেছিলাম অনেক অভিজ্ঞতা এবং আমি পা পিছলে পরে হাতের দফারফা করে ফেলেছিলাম । সেইবার হাম হাম ঘুরে এসে এত ভালো লেগেছিল যে ঠিক এক মাস পরে আমরা আবার ও হাম হাম যাই কিন্তু বন থেকে বের হই সন্ধ্যা ৭ টায় । সবুজে ঘেরা জীবনে শত কষ্টের পরে ও যে কি প্রশান্তি , আহ !!!!

লিখেছেন – ফান্ডামেন্টাল শরীফ

Leave a Reply