চোকারের ইতিকথা

মেয়েরা গলার সাথে আঁটসাঁট করে যে গহনা পরিধান করে তা চোকার নামে পরিচিত। চোকার কুন্দন, মখমল, প্লাস্টিক, জপমালা, ক্ষীর, চামড়া, ধাতু যেমন রৌপ্য, সোনার বা প্ল্যাটিনাম ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ধরণের উপাদান দিয়ে তৈরি হতে পারে।

নব্বই দশকের সময় চোকারের বেশ প্রচলন ছিল, তখন আমাদের মা দাদীরা শাড়ির সাথে চোকার পরতেন। এখন পুরনো অ্যালবাম হাতে নিলে চোখে পরবে। বর্তমান সময়ে আবারও এই চোকারের প্রচলন শুরু হয়েছে তবে এখন তো ফ্যাশন অনেক বেশী বিস্তৃত তাই আগের মত বলা যায় না চোকার শুধু শাড়ীর সাথেই মানানসই। বর্তমানের ফ্যাশন সচেতন প্রতিটি নারী চোকার শাড়ি ছাড়াও সেলোয়ার কামিজ, কুর্তি কিংবা ওয়েস্টার্ন ড্রেসের সাথে পরছেন।

চোকার নব্বই দশকে কিংবা এই বর্তমান সময়ে দেখা গেলেও চোকারে ইতিহাস অনেক পুরানো। ফাইন আর্টস জুয়েলার্স মিউজিয়ামের কিউরেটরের মতে “সুমেরিয়ান কারিগররা সোনার চোকার নেকলেসগুলি খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ এর কাছাকাছি তৈরি করেছিলেন”।

প্রাচীন মিশরের চোকার

চোকারের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো, বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতা, মেসোপটেমিয়া এবং প্রাচীন মিশরের সুমের সাম্রাজ্য থেকে চোকার চলে আসছে। তারা গলা, হাতে, পায়ে গহনা পরত তাদের নিরাপত্তার জন্য সাথে এও বিশ্বাস করত এইগুলো তাদের বিশেষ ক্ষমতা দিবে। সোনার চোকারের জন্য এটা বেশী সত্য ছিল। প্রাচীন লোকেরা সোনাকে সূর্যের সাথে তুলনা করে নিতো এবং লাইপিস (গাড় নীলবর্ণ মুল্যবান প্রস্ত্তর বিশেষ) কে মিশরের লোকেরা নীল নদের জীবনদানকারী শক্তির সাথে যুক্ত করেছিল।

নেটিভ আমেরিকান ট্র্যাডিশনে নানা ধরনের জুয়েলারি ও পোশাক দেখা যায় তার মাঝে চোকারও আছে। তারা চোকারের অংশগুলো নেয় হাড়, কাঁচের বিডস ও শামুকের খোলস থেকে। তারা এইটি প্রশস্থ করে বানাতো তাতে তাদের গলার অর্ধের ঢেকে যেতো । এই চোকার মূলত যোদ্ধাদের জন্য ঘাড়ের সুরক্ষা, পাশাপাশি উপজাতীয় অনুষ্ঠানের জন্য একধরণের পোশাক হিসাবে তৈরি করা হয়েছিল।

পূর্ব আফ্রিকাতে মাসাইদের মধ্যে চোকার অনেক ধর্মীয় নিয়ম নীতি পালন করে হত। তাদের সংস্কৃতিতে গহনাগুলি কেবল গহনাই বুঝায় না, বিশেষ অনুষ্ঠান এবং সম্পর্কও বুঝায়। বিশেষত বিবাহের জন্য তা বেশী পালনীয়। বিয়ের কনেরা সুন্দর কারুকাজ যুক্ত উজ্জ্বল রঙের চোকার পরে এবং এর বিভিন্ন উপকরণ ও  রঙগুলি বিভিন্ন অর্থ বহন করে। চোকারগুলোর সাইজ তাদের সম্পদের ইঙ্গিত করে এবং বিয়ের পরেও তারা এইগুলো প্রতিনিয়ত ব্যবহার করত।

ইউরপের ফরাসি বিপ্লবে এই চোকারের উপস্থিতি দেখা যায়। ১৭০০ সালের দিকে স্পেন ও ইংল্যান্ড রয়্যালদের কাছে চোকার একটা স্টাইল ছিল। তবে ফ্রান্সে, সাধারণরা কেবল তাদের সাজানোর চেয়ে অনেক গভীর উদ্দেশ্য নিয়ে স্টাইলটি গ্রহণ করেছিল। এই সময়ের মহিলারা যারা “গিলোটিনের” শিকার হয়েছিলেন তাদের নিঃশব্দ শ্রদ্ধা প্রদর্শন হিসাবে চোকরে বেঁধে লাল ফিতা পরতেন। এগুলি আরও ফ্যাশনেবল চেহারার জন্য পিছনে বাঁধা, বা পিছনে একটি “x” এর মত করে তারা পরত। এই লাল ফিতার চোকার গুল খুব দ্রুত ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পরে তা সংহতি প্রকাশ করতো। চোকারগুলোকে আরো ফ্যাশনেবল করার জন্য, মহিলারা তাদের ফিতাগুলিকে জুয়েলারি বাবোল বা ক্যামো পিনের দাড়া সজ্জিত করেছিল।

লিখেছেনসৈয়দা ফাতিমা মম

Leave a Reply