চোখের যত অসুখ-বিসুখ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী

চোখের রোগ বিভিন্ন রকমের। এর মধ্যে কিছু রোগ আছে যেগুলো মানুষের প্রধানত অন্ধত্বের জন্য দায়ী।

চক্ষু পল্লবের রোগ

জন্মগতভাবে চক্ষু পল্লবে ফাঁক থাকতে পারে। অল্প ফাঁক থাকলে কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন না হলেও চলে। বেশি ফাঁক থাকলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চক্ষু পল্লব ঠিক করে নেয়া উচিত।

অ্যাপিক্যানথাস রোগও জন্মগতভাবে হতে পারে। এ রোগের বৈশিষ্ট্য হল ত্বকের একটি খাড়া ভাঁজ নাকের গোড়া থেকে চক্ষু পল্লবের অন্তকোণ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। সাধারণত এর জন্য কোনো চিকিৎসা না করলেও চলে। অনেকেই চেহারার সৌন্দর্যের কথা চিন্তা করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অ্যাপিক্যানথাসমুক্ত হয়ে থাকেন।

ব্লেফারাইটিস

অক্ষিপল্লবের প্রান্তের প্রদাহকে ব্লেফারাইটিস বলে। এ রোগ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এ রোগ হলে অক্ষিপল্লবের প্রান্তে ছোট ছোট দানার মতো খুশকি হয়। রোগাক্রান্ত জায়গাটুকু লাল ও একটু ফোলা লাগতে পারে। অনেক সময় সামান্য ঘায়ের মতো হতে পারে; যারা এই ব্লেফারাইটিসে আক্রান্ত হন, তাদের অনেকের মাথায় খুশকি দেখা যায়। চোখের খুশকি সঠিক চিকিৎসা ও চোখের স্বাস্থ্যকর অবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে সারানো যেতে পারে। অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চোখের অ্যান্টিবায়োটিক স্টেরয়েড মলম নিয়মিতভাবে কিছুদিনের জন্য লাগাতে হতে পারে।

অঞ্জনি

চক্ষু পল্লবের কেশ প্রান্তের ফলিকল এবং জেইস গ্রন্থির পুঁজ সৃষ্টিকারী সংক্রমণকে অঞ্জনি বলে। এ রোগে আক্রান্ত চক্ষু পল্লব লাল হয়ে ফুলে যায়, ব্যথা এবং পরের দিকে সাদা পুঁজবিন্দু দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিদিন দু’বার করে গরম সেঁক দিলেই অঞ্জনি সেরে যায়।

ক্যালাজিয়ন

এটি হচ্ছে বিমোমিয়ান গ্রন্থির প্রদাহজনিত গ্রানোমালা। দেখতে গণ্ডিকাকৃতি এবং সাধারণত অক্ষিপল্লবের প্রান্ত থেকে একটু দূরে হয়। ইনফেকশন না হলে ব্যথা হয় না। ছোট আকারের ক্যালাজিয়ন বিনা চিকিৎসায় সেরে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বহুদিন অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকে। অনেক সময় ক্যালাজিয়ন ফুলে ব্যথা হয় এবং ভেতরের বা ত্বকের দিকে ফেটে যায়। বড় ক্যালাজিয়ন হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে। এ অস্ত্রোপচার অক্ষিপল্লবের ভেতর দিক কেটে করা হয়। অক্ষিপল্লবে কোনো কাটার দিক থাকে না।

অ্যানট্রোপিয়ন

এই রোগ হলে অক্ষিপল্লব পাপড়িসহ চোখের ভেতরে ঢুকে থাকে। নেত্রস্বচ্ছে পাপড়ির আঘাত লাগার ফলে চোখ খচখচ করে। মনে হয় চোখে কিছু পড়েছে এবং চোখের প্রদাহ দেখা দেয়। কর্ণিয়ার প্রদাহে, বার্ধক্যে ও বহুদিন চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা থাকলেও এ রোগ হতে পারে। অনেক সময় অক্ষিপল্লবে আঘাতজনিত কারণেও এ রোগ হয়ে থাকে। বার্ধক্যজনিত কারণে অ্যানট্রোপিয়ন সাধারণত নিচের অক্ষিপল্লবেই দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় পাপড়িসহ অক্ষিপল্লবেই দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় পাপড়িসহ অক্ষিপল্লব চোখের ভেতর থেকে বাইরে রাখতে পারলে এ রোগ ভালো হয়ে যেতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়।

একট্রোপিয়ন

এ রোগে অক্ষিপল্লবের বাইরের দিক উল্টে যায়। বার্ধক্য ও অবসন্নজনিত কারণে এবং অরবিকুলারিস মাংসপেশির খিঁচুনির জন্য একট্রোপিয়ন দেখা দিতে পারে। এ রোগ সারাতে প্লাস্টিক সার্জারির দরকার পড়ে।


আর পড়ুন


আরো পড়ুন



অক্ষিপল্লবের অন্যান্য রোগ

অনেক সময় অক্ষিপল্লব ঠিকমতো বন্ধ হয় না। এ অবস্থায় নেত্রস্বচ্ছ শুকিয়ে যেতে পারে বা ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। নেত্রস্বচ্ছ যাতে শুকিয়ে না যায়, সেজন্য চোখের সাধারণ মলম ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। অনেক সময় সাময়িকভাবে চোখের পাতা সেলাই করে চোখ ঢেকে রাখা হয়। অক্ষিপল্লবে নানারকম টিউমার হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন।

অশ্রু ও অশ্রুথলির রোগ

অশ্রু নিষ্কাশন পথ বন্ধ হলে বা বেশি অশ্রুক্ষরণ হলে চোখ দিয়ে পানি পড়ে। তবে অশ্রু নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হওয়ার কারণেই চোখ দিয়ে বেশি পানি পড়ে, বেশি অশ্রুক্ষরণের জন্য ততটি নয়। অশ্রুগ্রন্থিতে রোগ হলে চোখের পানি কম হয়। চোখ শুকিয়ে যেতে পারে। যেমন- রিউম্যাটিজমে এ অবস্থা হয়ে থাকে। ভিটামিন ‘এ’র অভাব, ট্রাকমা, কেরাটোকন টিভাইটিজ সিক্কা ইত্যাদি রোগে অক্ষিশুষ্কতা দেখা দিতে পারে।

নবজাত শিশুদের অশ্রুথলি প্রদাহ

জন্মের পরে অনেক শিশুরই অশ্রুথলি এবং নাকের সংযোগকারী নালিকার ছিদ্র তৈরি হয় না। এর ফলে চোখ দিয়ে পানি পড়ে এবং অশ্রুথলিতে প্রদাহ হয়। সাধারণত নালিকার ছিদ্র উপত্যকায় স্তূপ দ্বারা বন্ধ থাকার ফলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শে চোখের কোণ এবং অশ্রুথলির ওপর চাপ প্রয়োগ দ্বারাই অধিকাংশ শিশু এ রোগ থেকে নিস্তার পায়। অনেক ক্ষেত্রে এ রোগের চিকিৎসা হিসেবে অশ্রুথলি এবং নাকের সংযোগকারী নালিকার পথ পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয়।

অশ্রুথলি প্রদাহ

অশ্রুথলিতে পুঁজ জমে লাল এবং তীব্র ব্যথা হয়ে প্রাথমিক অশ্রুথলি প্রদাহ হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ না করলে ল্যাক্রিমাল অস্থিতে অস্টিওমাইলাইটিস হয়ে অস্থির ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে ভেতরের দিকে ফিসটুলা হতে পারে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে অক্ষিকোঠরের বা মুখমণ্ডলের সেলুলাইটিস, এমনকি কেভার্নাস সাইনাস থ্রমবোসিস হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গরম সেঁক, চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক এবং ব্যথা নিবারক ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন। পুঁজ হলে বা জটিলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী অশ্রুথলিতে প্রদাহ সাধারণত মধ্য বয়সের লোকদের বেশি হয়। রোগীদের মধ্যে স্ত্রীলোকের সংখ্যাই বেশি। এ অবস্থায় রোগীদের চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। মাঝে মাঝে অশ্রুথলির এলাকা ফুলে যেতে বা লাল হতে পারে। বেশিদিন স্থায়ী হওয়ার ফলে নেত্রস্বচ্ছে ক্ষত বারবার ইনফেকশন হয়ে থাকে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অস্ত্রোপচার করাই বাঞ্ছনীয়।

নেত্রস্বচ্ছ প্রদাহ (চোখ ওঠা)

জীবাণুর আক্রমণ, অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন কারণে নেত্রবÍকলার প্রদাহ হতে পারে। এ অবস্থাকে কনজাংটিভাইটিস বা সাধারণভাবে চোখ ওঠা বলে। বয়স নির্বিশেষে ছোট বড় সবাই চোখ ওঠা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে বয়স্কদের বেলায় নেত্রবÍ প্রদাহ অন্ধত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। চোখের ময়লা পরিষ্কার রাখলে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে চোখের ওষুধ ব্যবহার করলে চোখ ওঠা সেরে যায়। রোগ হলে অজ্ঞতা এবং কুসংস্কারের জন্য শামুকের রস, গাছের কোনো তরল পদার্থ চোখে প্রয়োগের ফলে চোখের কোষকলার অনিষ্টসাধন হতে পারে। এমনকি এসব বস্তু চোখে লাগানোর ফলে নেত্রস্বচ্ছে ক্ষতি হয়ে অনেকে অন্ধ হয়ে যেতে পারে।


আর পড়ুন – চোখে চোখ রাখলেই চোখ ওঠে না – সহযোগী অধ্যাপক, ডা. ফরিদুল হাসান


নবজাতকের নেত্রবÍ প্রদাহ

সদ্যপ্রসূত শিশুর চোখ ওঠা এবং শিশুর জন্মগ্রহণের তিন সপ্তাহের মধ্যে ‘চোখ ওঠা’ উভয়েই চক্ষু রোগের লক্ষণ। অধিকাংশ উন্নত দেশে এ সময়ের মধ্যে শিশু চোখ ওঠা রোগে আক্রান্ত হলে স্বাস্থ্য বিভাগকে বিজ্ঞপ্তিকরণ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। এ থেকেই এ রোগের ভয়াবহতা অনুধাবন করা যায়।

নেত্রবÍ প্রদাহের প্রধান লক্ষণ : চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং চোখে পিচুটি জমা। আঠাল পিচুটি পড়ার ফলে চোখের পাতা একে অপরের সঙ্গে আটকে থাকতে পারে। এ অবস্থা বিশেষ করে লক্ষণীয় হয় শিশু যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠে। পিচুটি না ছাড়িয়ে এ সময় চক্ষুপল্লব খোলা কষ্টসাধ্য হয়। পিচুটিকে অক্ষিপল্লব আটকে থাকার ফলে, চোখের কোষকলার মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই উষ্ণ পরিবেশে রোগজীবাণুর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে শিশুর নেতৃস্বচ্ছের (কর্নিয়া) কোষকলা বিনষ্ট হয়ে শিশু অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ছোট শিশুর নেত্রবÍ প্রদাহের লক্ষণ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। এ রোগ যাতে এক শিশুর চোখ থেকে অন্য কারো চোখে সংক্রমিত না হতে পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুর চোখে হাত বা ওষুধ লাগানোর পর প্রতিবারই হাত সাবান দিয়ে নির্মল পানিতে উত্তমরূপে ধুয়ে ফেলা উচিত। আক্রান্ত শিশুর অক্ষিপল্লব কোনো অবস্থাতেই যাতে পিচুটিতে আটকে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিষ্কার তুলা দিয়ে এবং প্রয়োজনে ফুটিয়ে নেয়া ঠাণ্ডা পানিতে তুলা ভিজিয়ে চোখের পিচুটি পরিষ্কার করে দিতে হবে।

সাধারণ অ্যালার্জি-নেত্রস্বচ্ছের প্রদাহ

এ রোগ দেহের ভেতরের বা বাইরের কোনো অ্যালার্জির কারণে হয়ে থাকে। বাইরের অ্যালার্জেনের মধ্যে রয়েছে ফুলের পরাগ, ঘরের ধুলো, ওষুধ, গাছ-গাছড়া ইত্যাদি। ভেতরের অ্যালার্জেনের মধ্যে কোনো সংক্রমিত স্থানের জীবাণুর অংশবিশেষ, বিশেষত স্ট্যাফাইলোকক্কাস।

এ অবস্থায় চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে। আলোভীতি, অস্বস্তিবোধ, চোখ চুলকানি, চোখ লাল হওয়া, নেত্রস্বচ্ছের কেমোসিস ইত্যাদি দেখা যায়। চিকিৎসার প্রধান শর্ত হচ্ছে অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী বস্তু দূর করতে হবে। এতে না সারলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।

ভারনাল কনজাংটিভাইটিস

এ রোগ জীবাণুর জন্য নয় বরং নেত্রবাত্মের (কনজাংটিভা) এক প্রকার হাইপার সেনসিটিভ রিঅ্যাকশন বহিস্থ অ্যালার্জেনের কারণে হয়ে থাকে। এ ব্যাধি সাধারণত গ্রীষ্ম এবং বসন্তকালে হয়ে থাকে। কোনো ফুলের পাপড়ির নির্যাস বাতাসে মেশার ফলে ধূলি বা ধূলিময় আবহাওয়া এ রোগের জন্য দায়ী। সাধারণত ছয় থেকে বিশ বছর বয়সের মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। এ ব্যাধির প্রধান উপসর্গ হচ্ছে চোখ চুলকানি, চোখ জ্বালা করা, আলোভীতি, পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়া। ভারনাল কনজাংটিভাইটিস চক্ষুপল্লবের ও চক্ষু গোলকের হয়। চক্ষুপল্লবের ভারনাল কনজাংটিভাইটিসে ওপরের চক্ষুপল্লবের নিচে শক্ত উঁচু দানা দেখা যায়। দানাগুলোর রং নীলাভ সাদা। নিচের চক্ষুপল্লবেও এ ধরনের দানা দেখা যেতে পারে। চক্ষু গোলকের ভারনাল কনজাংটিভাইটিস লিম্বাসের চতুর্দিকে জিলাটিনের মতো ঘন তন্তু দ্বারা গঠিত। এ তন্তু বড় এবং ঘন হয়ে নেত্রস্বচ্ছের ওপরে উঠতে পারে।

মনে রাখতে হবে এ রোগ অনেক সময় বেশি, আবার অনেক সময় কম হয়। এ রোগের জন্য কার্যকরী ওষুধ ব্যবহার করলে রোগ সেরে যায় বা বেশ কমে যায়। ওষুধ বন্ধ করলে রোগ আবার বেড়ে যেতে পারে বিশেষ করে চোখ চুলকানো এবং লাল হয়ে যাওয়া থেকে। পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য রোগীদের মধ্যে ওষুধ বেশি ব্যবহার করার প্রবণতা থাকাটাই স্বাভাবিক।

লেখক : চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী

Leave a Reply