ঘুরে আসুন থাইল্যান্ডের লম্বা গলা কায়ান নারীদের গ্রামে

জিরাফের মতো অস্বাভাবিক রকমের লম্বা গলাবিশিষ্ট একদল নারীর কাঁধের উপর থেকে চিবুকের নিচ পর্যন্ত গলার চারপাশে সোনালী ধাতববিশিষ্ট রিং পেঁচিয়ে রাখে। এই গলা নিয়েই তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই হাঁটা চলা করছে, দৈনন্দিন কাজকর্ম করে যাচ্ছে। মায়ানমার এবং থাইল্যান্ডের কিছু অঞ্চলে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি দৃশ্য।
লং নেক ওম্যান ভিলেজ অর্থাৎ লম্বা গলা নারীদের এই গ্রামের নাম অনেকেই শুনে থাকবেন। থাইল্যান্ডের চিয়াং মে-তে অবস্থিত এই গ্রামে যেসব নারী থাকেন তাদের গলা বিশ্বের অন্য সব নারীর তুলনায় অনেক লম্বা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ওই এলাকাটিই এখন লম্বা গলা মহিলাদের গ্রাম হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। কারণ এত লম্বা গলার মহিলাদের দেখা বিশ্বের আর কোথাও মেলে না। তাই এই গ্রাম পর্যটকদের কাছে বহুল পরিচিত। লম্বা গলার মহিলাদের দেখতে এবং তাদের ছবি তুলতে প্রতিনিয়তই এই গ্রামে হানা দেন পর্যটকেরা। এটি থাইল্যান্ডের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

থাইল্যান্ডের ‘লং নেক ওম্যান ভিলেজ’-এ মূলত কায়েন সম্প্রদায় মানুষই থাকেন। কায়েন সম্প্রদায় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে থাইল্যান্ডের বাসিন্দা নয়। কায়েন সম্প্রদায়ের আসল বসতি মায়ানমারের কায়াহ জেলার লয়কাওয়ে। তারা প্রধানত মায়ানমারের কায়ান লাহুই গোত্রের সদস্য। মায়ানমারের গৃহযুদ্ধে সেখানকার সেনাবাহিনী ও পুলিশের (জুন্টা বাহিনীর) অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য অনেক কায়ান উপজাতিই পার্শ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ডের উত্তরে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। থাইল্যান্ডের চিয়াং মে-র সেই উদ্বাস্তু শিবিরই ক্রমে কায়েন সম্প্রদায়ের নাম অনুসারে কায়েন গ্রাম হিসাবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে।

Long_Neck_Hill_Tribe_Thailand_karukormo_blog

জন্ম থেকেই অবশ্য কায়েন সম্প্রদায়ের নারীদের ‘জিরাফ’-এর মতো লম্বা গলা হয় না। এ লম্বা গলার পেতে তাদেরকে কষ্টও করতে হয়।
এই গ্রামে কোনও কায়েন কন্যার জন্ম হলে, তার ৪ – ৫ বছর বয়স থেকেই গলায় সোনালী রঙের পেঁচানো রিং পরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবছর রিঙের প্যাঁচ বাড়তে থাকে। এ ভাবে একটার পর একটা রিং যোগ করা হয় ২১ বছর পর্যন্ত। রিংগুলো হাতেই পরানো হয় বলে এতে প্রচুর সময় ব্যয় হয় এবং অত্যন্ত দক্ষ কারিগর প্রয়োজন হয়। ফলে একবার পরানোর পর সেগুলো বছরের পর বছর ধরে আর খোলা হয় না। কেবলমাত্র পুরনো রিং পাল্টে নতুন এবং বড় আকৃতির রিং প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হলেই তা খোলা হয়। ফলে কেউই ৫ বছর বয়স থেকে নিজেদের গলা চোখে দেখেন না। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারীই ৫ কেজি ওজনের রিং পরে থাকে।

ব্রিটিশ সাংবাদিক জে. জি. স্কটের ভাষায়, রিং পরা মেয়েরা যখন কথা বলে, তখন মনে হয় যেন তারা কুয়ার তলদেশ থেকে বলছে।

রিং পরিধান করা অবস্থায় কায়ান নারীরা প্রায় সব ধরনের কাজকর্মই করতে পারে। তাদের চলাফেরায় এটা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। অবশ্য মাথা খুব বেশি পরিমাণে ঝোঁকাতে না পারায় খাবার খেতে, বিশেষ করে তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে তাদের কিছুটা অসুবিধা হয়।

২১ বছর পর যখন এই রিং তাদের গলা থেকে খোলা হয়, গলায় রিংয়ের কালো দাগ বসে যায়। গলাটা অদ্ভুদ রকমের সরু আর লম্বা দেখায়। দীর্ঘদিন ধরে পিতলের রিং দ্বারা গলা আবৃত থাকার কারণে কায়ান নারীদের গলার চামড়া বিবর্ণ হয়ে যায় এবং পেশীগুলো দুর্বল হয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে মাথার ভার রিংয়ের উপর ন্যস্ত থাকায় তাদের গলা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে একটা বয়সের পরে যখন কোনো নারী তার গলার রিং খুলে ফেলে, তখন প্রথম কয়েক দিন তার প্রচন্ড অস্বস্তি হয়। যদিও সময়ের সাথে সাথে তা সহ্য হয়ে যায়।


আরো পড়ুন ……


আরো পড়ুন



এ পর্যায়ে একটা তথ্য দিচ্ছি, পিতলের রিংগুলো প্রকৃতপক্ষে গলা লম্বা করতে পারে না। এই ভারী ধাতব রিং কায়ান মহিলাদের গলা লম্বা না করে দুই কাঁধের হাড়কে দু’দিকে অস্বাভাবিক ঢালু করে দেয়। থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া কায়ান শরণার্থী নারীদের গলা এক্সরে করে ডাক্তাররা দেখতে পান, দীর্ঘদিন ধরে রিং পরলেও তাদের গলার হাড়ের দৈর্ঘ্য বা হাড়গুলোর মধ্যবর্তী ব্যবধানের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং রিংগুলোর চাপে তাদের বুকের খাঁচা এবং কাঁধ কিছুটা নিচের দিকে বসে যাওয়ার কারণেই তাদের গলাকে লম্বা বলে ভ্রম হয়।

গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা গলার নারীও একজন কায়ান, যার গলার দৈর্ঘ্য ১৫.৭৫ ইঞ্চি।

গলা লম্বা করার এই সংস্কৃতি কায়ানদের মধ্যে কোথা থেকে এসেছে, সেটা নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক সাংবাদিক এবং গবেষকের বর্ণনায় এর উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
– বংশপরম্পরায় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য রক্ষা করতেই আসলে নিজেদের গলা লম্বা করে নেন গলায় পেঁচানো রিং পরে। একটা সময় প্রায় প্রতিটি কায়ান লাহুই পরিবারের অন্তত একটি করে মেয়ে রিং পরিধান করে গলা লম্বা করার ঐতিহ্য বজায় রাখত।
– কায়ানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তারা ড্রাগনের বংশধর। তারা মনে করে, অতীতে কোনো এক সময় এক নারী ড্রাগনের সাথে স্বর্গীয় দূতের মিলনের ফলে তাদের বংশের আদি পুরুষদের জন্ম হয়েছে। অনেকের মতে, সেই লম্বা গলা বিশিষ্ট আদি মাতা ড্রাগনের সম্মানার্থেই কায়ান নারীদের মধ্যে গলা লম্বা করার সংস্কৃতির প্রচলন হয়েছিল।
– ভিন্নমতও অবশ্য আছে। কেউ কেউ দাবি করেন, এই রিংগুলো পরার প্রচলন হয়েছিল আত্মরক্ষার জন্য। মায়ানমারের কায়াহ জেলায় আগে অনেক বাঘ ছিল। তখন নিজেদের রক্ষা করতেই গলা, হাত, পা, কোমর ইত্যাদি জায়গায় এই শক্ত রিং তাঁরা পরতেন। ক্রমে সেটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
– আবার কারো মতে, প্রাচীনকালে গলায় রিং পরিয়ে মেয়েদেরকে অনাকর্ষণীয় করে রাখা হতো, যেন তারা পার্শ্ববর্তী গোত্রের পুরুষদের নজরে না পড়ে। অবশ্য পরবর্তীতে এই রিং পরাটাই সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
– কায়ান নারীদের অধিকাংশই তাদের মা এবং দাদীদের ধারাবাহিকতায় এই সংস্কৃতি পালন করে থাকে। তাদের অনেকেই এটাকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখে।

বিশ্বের বাকি মানুষের কাছে সেটা অদ্ভুত ঠেকলেও লম্বা গলা কায়েন সম্প্রদায়ের কাছে কিন্তু গর্বের বিষয়। যার গলা যত লম্বা, কায়েনদের কাছে তিনিই তত সুন্দরী। এগুলো কায়ানদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির পাশাপাশি নারীদের সৌন্দর্য, তাদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদা এবং বিত্ত এর পরিচয় দেয়।

Long_Neck_Hill_Tribe_Thailand_karukormo_blog
অধিকাংশই মা এবং দাদীদের ধারাবাহিকতায় এই সংস্কৃতি পালন করে থাকে

কায়ান নারীদের শত শত বছরের এই ঐতিহ্য অবশ্য এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। গত কয়েক দশকে অনেক নারীই তাদের রিং বিসর্জন দিয়েছে। তারা এই রিংকে অপ্রয়োজনীয়, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং নারী স্বাধীনতার অন্তরায় হিসেবে দেখছে। তবে তা সত্ত্বেও এখনও অনেক কায়ান নারীই এই সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে আছে। এদের মধ্যে যারা বয়স্ক, তারাই শুধু সত্যিকার অর্থে ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধারণের উদ্দেশ্যে এখনও রিং বিসর্জন দেয়নি। কিন্তু এর বাইরে একটি বড় অংশ আছে, যারা এখনও এই সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে শুধুমাত্র জীবিকা উপার্জনের স্বার্থে।

কায়ান নারীদের অদ্ভুত দর্শনের এই ফ্যাশন বিদেশী পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সারা বছর ধরে প্রচুর পর্যটক এই গ্রামে ভিড় জমান কায়েনদের দেখতে। গ্রামটাকে এখন লম্বা গলা নারীদের গ্রাম হিসেবেই সবাই চেনে।
থাইল্যান্ড সরকার যখন কায়েনদের লম্বা গলার কথা শোনে, দেশের পর্যটন ব্যবসার উন্নতির পরিকল্পনা করে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে একটি পর্যটন কেন্দ্রিক গ্রামে। তারপর থেকে কায়েনরা ওই গ্রামেই স্থায়ী ভাবে থাকতে শুরু করেন। যেখানে এই নারীদেরকে দেখতে যাওয়া পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশমূল্য হিসেবে অর্থ উপার্জন করে কর্তৃপক্ষ। তবে শুধু প্রবেশমূল্য না, পর্যটকদের কাছে হস্তনির্মিত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করেও কায়ানরা বেশ ভালো উপার্জন করতে পারে। ফলে তারা আর্থিক ভাবে অনেকটাই সাবলম্বী হয়েছেন।

তবে লম্বা গলা নারীদের গ্রাম নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করেন, এই গ্রাম আসলে একটা চিড়িয়াখানা। এই চিড়িয়াখানায় ‘বন্দি’ হয়ে আছেন কায়েন নারীরা আর তাদের দেখিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করছে থাইল্যান্ড সরকার।

লিখেছেন – সৈয়দা ফাতেমা আমীন

Leave a Reply